করোনার নেতিবাচক প্রভাব : রেলের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে শঙ্কা

করোনার নেতিবাচক প্রভাব : রেলের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে শঙ্কা
করোনার নেতিবাচক প্রভাব : রেলের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে শঙ্কা

সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রেলের দুটি মেগা প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন প্রকল্পে কর্মরত চীনাদের অনুপস্থিতি এ শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

প্রকল্প দুটিতে এক হাজারেরও বেশি চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিক নিয়োজিত। চৈনিক নববর্ষ উদযাপনে তিন শতাধিক চীনা নাগরিক দেশে গেছেন। ছুটিতে যাওয়া প্রায় সবাই প্রকৌশলী। চীনের উহানে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস 

মহামারী আকার ধারণ করায় তারা ফিরতে পারছেন না। চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের অনুপস্থিতিতে প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন জানান, কমলাপুর থেকে গেণ্ডারিয়া হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ভাঙ্গা হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেললাইন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি প্রকল্প বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু চীনে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রকল্প দুটির ওপর প্রভাব ফেলছে। পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পে ৮৮৪ জন এবং কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-রামু রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে ১২০ জন চীনা ঠিকাদার-প্রকৌশলী ও শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে তিন শতাধিক প্রকৌশলী নববর্ষ উদযাপন করতে দেশে গিয়ে আটকা পড়েছেন। প্রকল্প দুটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকা প্রকৌশলীরা ফিরতে না পারায় পুরো প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রেলপথমন্ত্রী আরও বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন প্রকল্পে দায়িত্বশীল চীনা কর্মীদের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। তবে চীনা প্রকৌশলী ও কর্মীদের প্রয়োজন পদে পদে সামনে আসছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন থেকে এ সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চালানোর প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। প্রকল্পটি চায়না রেলওয়ে গ্র“প লিমিটেড (সিআরইসি) বাস্তবায়ন করছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে চীনাদের আসতে আরও ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগলে সময়মতো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রেলপথ মন্ত্রণালয় কৌশল পাল্টিয়েছে। একই সঙ্গে কমলাপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ না করে শুধু সেতুর ওপর এবং এর দুই পাশে ৪২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২৪ ঘণ্টা ৮৮৪ জন চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিক কাজ করছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা চীনাদের অনুপস্থিতি পুরো কাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে শ্রমিকরা কাজ করতে পারছেন না। ২৮ জানুয়ারি রেলপথ বিভাগ থেকে প্রকল্প এলাকার ৯টি জেলার সিভিল সার্জন অফিসকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে- প্রকল্পে কর্মরত চীনাদের করোনাভাইরাস সংক্রমণসংক্রান্ত বিষয়ে সতর্ক ও সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদানের।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন প্রকল্পে অন্তত ১২৫ চীনা নাগরিক সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৩১ জন ছুটিতে রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কেউ ফিরে আসেননি। আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা কাজ করছেন। এ প্রকল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকা চীনা প্রকৌশলীরা ছুটি থেকে ফেরেননি।

প্রকল্পটি দুটি লটে ভাগ করে কাজ করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার প্রথম এবং চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত দ্বিতীয় লটে কাজ হচ্ছে। দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (সিসিইসিসি) এবং দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (সিআরইসি) দুটি লটে কাজ করছে। এ প্রকল্পেও করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে চীনা শ্রমিকদের অনুপস্থিতির সঙ্গে চীন থেকে আসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশেরও ঘাটতি হতে পারে।

ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর যুগান্তরকে জানান, এ প্রকল্পে থাকা চীনাদের অনুপস্থিতি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তবে আমাদের দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। আমাদের পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট রয়েছে। দক্ষ শ্রমিকও রয়েছে। কিন্তু জেভির (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মাধ্যমে কাজ হওয়ায় চীনা ঠিকাদার, প্রকৌশলী, শ্রমিকের অনুপস্থিতি আমাদের চিন্তায় ফেলছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের চ্যালেঞ্জই বেশি। আমরা দিন-রাত কাজ করছি। সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আরও প্রকৌশলী ও শ্রমিক যুক্ত করছি। সমস্যা মোকাবেলা করছি।

তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানির চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন স্থাপন প্রকল্পের সঙ্গে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পেও প্রভাব পড়ছে। প্রকল্প ম্যানেজার ও প্রকৌশলী ছাড়া অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। চীনাদের সঙ্গে ইমেল, ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে প্রজেক্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকল্পগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদি চীন থেকে আনতে হচ্ছে। চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এ মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রাংশ আসছে না। এতে করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হবে। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ বিশেষ প্রজেক্ট ম্যানেজার ছুটিতে থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, এ প্রকল্পে ৮৮৪ জন চীনা নাগরিক কাজ করছেন। চীনা ঠিকাদারি কোম্পানির প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা প্রকৌশলীদের অনুপস্থিতি বেশ ভাবিয়ে তুলছে। ছুটি শেষে প্রকল্প পরিচালকসহ ১৬ জন বাংলাদেশে ফিরলেও প্রায় ২৫০ জন ফেরেননি। দীর্ঘ সময় ধরে তারা অনুপস্থিত থাকলে প্রকল্পে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। যারা ফিরেছেন তাদের আলাদা করে রাখায় তারাও কাজে যোগ দিতে পারছেন না।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রামু রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান যুগান্তরকে জানান, মেগা এ প্রকল্পে চীনাদের অনুপস্থিতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ প্রকল্পে ১২৫ জনের মতো চীনা ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও শ্রমিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ৩১ জন ছুটিতে রয়েছেন। তাদের ছাড়া মাঠপর্যায়ের বিশেষ নির্মাণ কাজগুলো যথাযথভাবে হচ্ছে না। তাদের অভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চাপ প্রয়োগ করে অথবা জরুরি ভিত্তিতে তাদের আনার পক্ষে আমরা নই। মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি।

১টি মন্তব্য

রিপ্লে

মন্তব্য লিখুন!
নাম